উন্নত অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি টিকিয়ে রাখতে বিদেশী কর্মীদের অংশগ্রহণ আরো বাড়াতে হবে বলে সতর্ক করে দিয়েছেন বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নীতিনির্ধারকরা। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াইওমিং অঙ্গরাজ্যের জ্যাকসন হোলে অনুষ্ঠিত এক বার্ষিক বৈঠকে তারা বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি স্থিতিশীল রাখতে আগামী কয়েক দশকে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিগুলো যথেষ্ট শ্রমশক্তির অভাবে ভুগবে। কারণ জন্মহার হ্রাস ও বয়স্ক জনগোষ্ঠীর বৃদ্ধি। এ সমস্যা নিরসন করতে পারে উন্নত অর্থনীতিতে বিদেশী কর্মীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ। খবর এফটি ও রয়টার্স।
শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের এ বৈঠকে অংশ নেন বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রধানরা। এমন একসময় অভিবাসনের পক্ষে তারা মন্তব্য করলেন যখন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোয় অভিবাসনবিরোধী মনোভাব ক্রমেই বাড়ছে। সরকারগুলোও বিদেশীদের বিষয়ে আগের তুলনায় কঠোর হচ্ছে।
অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ দেশগুলোয় জন্মহার ইতিহাসের সর্বনিম্নে, অথচ আয়ুষ্কাল বেড়েছে। ফলে ডিপেন্ডেন্সি রেশিও অর্থাৎ কর্মক্ষম বয়সের বাইরের জনগোষ্ঠীর অনুপাত অনেক বেশি হয়ে গেছে।
জন্মহার হ্রাস ও বয়স্ক জনগোষ্ঠীর বৃদ্ধি প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকাররা বলছেন, এতে শুধু উৎপাদন কমাবে না, বরং মজুরি বৃদ্ধির চাপ মূল্যস্ফীতিও বাড়াতে পারে। কারণ শ্রমবাজারে চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট সরবরাহ না থাকলে কর্মীরা বেশি বেতন দাবি করতে পারেন। এতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন ব্যাংক অব জাপানের (বিওজে) গভর্নর কাজুও উয়েদা, ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের (ইসিবি) প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিন লাগার্দে ও ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের (বিওই) গভর্নর অ্যান্ড্রু বেইলি।
কাজুও উয়েদা জানান, শ্রমশক্তির ঘাটতি জাপানের অর্থনীতিতে অন্যতম জরুরি সমস্যায় পরিণত হয়েছে। বিদেশী কর্মীরা দেশটির মোট শ্রমশক্তির মাত্র ৩ শতাংশ। কিন্তু শ্রমবাজারের সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধিতে তাদের ভূমিকা অর্ধেকের মতো। কাজুও উয়েদা বলেন, ‘বিদেশী কর্মীদের প্রবেশ আরো বাড়াতে হলে অবশ্যই বিস্তৃত আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।’
ইসিবি প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিন লাগার্দের ভাষ্যে, ‘ইউরোপে জনমিতির নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন বিদেশী কর্মীরা। তারা না থাকলে ২০৪০ সালের মধ্যে ইউরোজোনে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ৩৪ লাখ কমে যাবে।’
তিনি জানান, কভিড-মহামারীর পর ইউরোজোনের শ্রমবাজার অপ্রত্যাশিতভাবে ভালো ছিল, যার একটি কারণ বেশি বয়সী শ্রমিকদের কাজে ফেরা। তবে এর চেয়েও বড় ভূমিকা রেখেছে বিদেশী কর্মী বৃদ্ধি।
ক্রিস্টিন লাগার্দে বলেন, ‘২০২২ সালে মোট শ্রমশক্তির মাত্র ৯ শতাংশ ছিলেন বিদেশী কর্মী। কিন্তু তিন বছরে ইউরোজোনের শ্রমবাজার প্রবৃদ্ধির অর্ধেকের পেছনে ছিলেন তারা। তাদের অবদান ছাড়া শ্রমবাজারের অবস্থা আরো কঠিন হয়ে উৎপাদন কমে যেত।’
ইউরোপে কর্মঘণ্টা হ্রাস ও আয়-ব্যয়ের অনুপাতে প্রকৃত মজুরি কমেছে। এ শূন্যতা পূরণ করেছেন বিদেশীরা, ফলে ইউরোজোনের অর্থনীতি ভেঙে পড়েনি। বরং উল্টো কিছুটা দৃঢ় অবস্থা বজায় রেখেছে বলে জানান তিনি।
গত বছর ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) জনসংখ্যা বেড়ে ৪৫ কোটি ৪০ লাখ পৌঁছায়। কারণ নিট অভিবাসন টানা চতুর্থ বছরের মতো জন্মহার হ্রাসের ক্ষতি পুষিয়ে দিয়েছে। ক্রিস্টিন লাগার্দে বলেন, ‘ইউরোজোনভুক্ত ২০ দেশের বাইরের কর্মী বৃদ্ধি অর্থনীতিকে সহায়তা করেছে। যদিও অনেক খাতে মানুষ কম সময় কাজ করতে চাইছে এবং জীবনমান কমে গেছে।’
তিনি আরো জানান, বিদেশী কর্মী না থাকলে ২০১৯ সালের তুলনায় জার্মানির জিডিপি প্রায় ৬ শতাংশ কম হতো।
এদিকে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর অ্যান্ড্রু বেইলি জানান, ২০৪০ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ ব্রিটিশ ১৬-৬৪ বছরের সাধারণ কর্মক্ষম বয়সসীমার ঊর্ধ্বে চলে যাবে। এছাড়া যুক্তরাজ্যে দীর্ঘমেয়াদে অসুস্থ মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি ও তরুণদের মাঝে কাজে অংশগ্রহণের প্রবণতা কমে গেছে। অ্যান্ড্রু বেইলির মতে, এ দুটি বিষয় পরস্পর সম্পর্কিত হতে পারে। যেখানে মানসিক স্বাস্থ্যই সবচেয়ে সাধারণ কারণ এবং এটি উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
অ্যান্ড্রু বেইলি জানান, বেকারত্বের তুলনায় শ্রমশক্তি থেকে সরে যাওয়া বা নিষ্ক্রিয়তা পরিমাপের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড। অর্থাৎ যারা একেবারেই শ্রমবাজারের বাইরে চলে যাচ্ছে তাদের সংখ্যা ও কারণ বোঝার ওপর জোর দিচ্ছে বিওই। তিনি আরো যোগ করেন, ইংল্যান্ডে বেশি বয়সী নারীরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু পুরুষদের ক্ষেত্রে তা ঘটছে না।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অনেক দেশে অভিবাসনবিরোধী মনোভাব জোরালো হয়েছে, যা কিনা রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন দেশে ভোটারদের ক্ষোভ বাড়ছে এবং অনেকেই ডানপন্থী দলগুলোর দিকে ঝুঁকছে। জার্মানির নতুন সরকার ভোটারদের সমর্থন পুনরুদ্ধারে অভিবাসীদের পারিবারিক পুনর্মিলন ও পুনর্বাসনবিষয়ক কর্মসূচি স্থগিত করেছে। মূলত অলটারনেটিভ ফর জার্মানি পার্টির উত্থান ঠেকাতে এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসীদের গ্রেফতার বেড়েছে। অনেক দেশে উড়োজাহাজ করে এ ধরনের অভিবাসীদের ফেরত পাঠানো হয়েছে। বিশ্বের শীর্ষ এ অর্থনীতি বেআইনি সীমান্ত পারাপারে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে। চলতি বছরের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রে লক্ষাধিক অভিবাসীর বৈধ মর্যাদা বাতিল হয়েছে।